মো. আবদুর রউফ:
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষা, সংস্কৃতি ও হাজার বছরের বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য সংরক্ষণে এক অনন্য ও অনুকরণীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে খাগড়াছড়ি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ। শিক্ষার্থীদের বহুভাষিক শিক্ষায় পারদর্শী করে তোলা, নিজ ভাষার চর্চা বজায় রাখা এবং সর্বোপরি পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতির চেতনা বিকাশের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে ‘চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষা শিক্ষা ক্লাব–২০২৬’।
সোমবার (২০ জুলাই) খাগড়াছড়ি সদর দপ্তর ২০৩ পদাতিক ব্রিগেডের বিশেষ নির্দেশনায় ও পরিচালনায় আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই ক্লাবের যাত্রা শুরু হয়।
খাগড়াছড়ি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি এবং ২০৩ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কে এম ওবায়দুল হক, এএফডব্লিউসি, পিএসসি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ক্লাবটির শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুহাম্মদ আতিকুল হক, পিএসসি-র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি সদর জোন কমান্ডার লে. কর্নেল আমিনুর রহমান, পিএসসি।
অনুষ্ঠানের অন্যতম মূল আকর্ষণ ছিল মারমা ভাষার প্রশিক্ষকের চমৎকার উপস্থাপনা, যেখানে তিনি উপস্থিত সকল সামরিক-বেসামরিক অতিথি ও শিক্ষার্থীদের নিজ ভাষার বর্ণমালার সাথে স্বচক্ষে পরিচিত করান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কে এম ওবায়দুল হক এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের প্রশংসা করে বলেন, ‘মাতৃভাষার সংরক্ষণ কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর একক দায়িত্ব নয়, বরং তা পুরো জাতির সাংস্কৃতিক ও জাতিতাত্ত্বিক সমৃদ্ধির অপরিহার্য অংশ। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষা শেখার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পার্বত্য অঞ্চলের ইতিহাস, নিজস্ব বর্ণমালা, অনন্য সংস্কৃতি ও জীবনধারা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ বাস্তব জ্ঞান অর্জন করতে পারবে। এই ধরনের উদ্যোগ পাহাড়ি ও বাঙালির মধ্যে বিদ্যমান পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে।’
ক্লাবের আওতায় চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষাভাষী শিক্ষার্থীরা দক্ষ প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ নিজ ভাষার লিখিত রূপ, বর্ণমালা শিক্ষা, সাহিত্য চর্চা ও সংরক্ষণের সুযোগ পাবে। এছাড়া ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সম্মান জানাতে এই ভাষাগুলোর ওপর নিয়মিত শিখন-শেখানো কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
স্কুলে নিজ ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে শিক্ষার্থীরা। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী অর্পনা চাকমা, শোভিত মারমা ও আরাভ ত্রিপুরা অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের নিজ নিজ ভাষার বর্ণমালা ও ঐতিহ্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্কুলে বসে শিখতে পারব, তা ভেবে আমরা দারুণ আনন্দিত ও গর্বিত। এখন এই ক্লাবের মাধ্যমে আমরা যেমন নিজেদের ভাষা সঠিকভাবে শিখতে ও সংরক্ষণ করতে পারব, তেমনি একে অপরের সংস্কৃতি সম্পর্কে জেনে আমাদের মধ্যকার পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও গাঢ় হবে। এমন চমৎকার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমরা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ২০৩ পদাতিক ব্রিগেডের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’
অনুষ্ঠানে সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, উপাধ্যক্ষ, সহকারী প্রধান শিক্ষক, স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকবৃন্দ, অভিভাবক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাতাত্ত্বিক প্রশিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।